দেশের প্রচলিত মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও দক্ষতাসম্পন্ন করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন চারটি পাঠ্যবই শিক্ষাক্রমে যুক্ত হতে যাচ্ছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের দুই শ্রেণির জন্য এই বিশেষ পাঠ্যপুস্তকগুলো প্রণয়ন করেছে। নতুন এসব বইয়ে শারীরিক সক্ষমতা, সাংস্কৃতিক চেতনা, কারিগরি জ্ঞান এবং ভীতিহীন শিখন পদ্ধতির সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার গতানুগতিক মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে এনে আরও বেশি আনন্দময়, জীবনমুখী ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দক্ষ করে গড়ে তুলতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের দুই শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন চারটি। এর অধীনে এনসিটিবি একটি টিম গঠন করে, যেখানে এসব পলিসি প্রণয়নে যারা প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করেছেন, তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এনসিটিবি সংশ্লিষ্টরা জানান,সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আনন্দ, খেলাধুলা, সংস্কৃতির মেলবন্ধন এবং হাতে-কলমে কারিগরি দক্ষতানির্ভর পাঠ্যপুস্তক প্রণীত হয়েছে।
প্রস্তাবিত নতুন বইগুলোর মধ্যে রয়েছে চতুর্থ শ্রেণির জন্য ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘ ১৫ বছরের বহুমুখী গবেষণা, রূপকল্প ও নির্দেশনার আলোকে শিক্ষাব্যবস্থায় এসব আধুনিক সংস্কার আনা হচ্ছে। শিক্ষাকে আনন্দময় ও নৈতিকতাভিত্তিক করার যে দর্শন প্রধানমন্ত্রী ধারণ করেন, তারই বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে এই পাঠ্যবইগুলোর অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যে চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতা ও গবেষণা পরিচালনা করেছেন- তারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে নতুন এই বইগুলো।’।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের অংশ হিসেবেই শিক্ষা ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ফসল এই বহুমুখী পরিকল্পনা। উপদেষ্টা জানান, নতুন বইগুলোতে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার ও সুনাগরিকের গুণাবলি তৈরির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এই কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এনসিটিবি বিশেষজ্ঞ টিম ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সাথে গত ১৫ বছর এ বিষয়ে আমি নিজে কাজ করে যেটা বুঝেছি— উনি চান শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি তৈরি হবে। যার কারণে নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এই কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার জন্য এনসিটিবিকে সম্পৃক্ত করা হয়। পাশাপাশি আরও অনেক বরেণ্য শিক্ষাবিদ আছেন, যারা বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে জড়িত; তারা প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্পটাকে বাস্তবায়নের জন্য ধারাবাহিকভাবে কনসালটেশন এবং মিটিং করেন।’।
শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি (এনসিসি) আগামীকাল ২৫ অক্টোবর বইগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে। অনুমোদনের পর মুদ্রণের জন্য প্রেসে পাঠানো হবে। এনসিটিবি জানিয়েছে, আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ কপি বই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে এবং ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে মুদ্রণ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় এসব বইয়ের রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়েছিল, যা পরে বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। ২৫ অক্টোবর এনসিসির সভায় অনুমোদনের পরই কন্টেন্টগুলো মুদ্রণের জন্য প্রেসে পাঠানো হবে।’।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ১৪টি অধ্যায়ে প্রণীত ‘খেলাধুলা’ বইটির উদ্দেশ্য হলো শিশুদের স্বাস্থ্য সচেতন ও ক্রীড়াচর্চায় আগ্রহী করে তোলা।
এতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, সাঁতার, দাবা ও অ্যাথলেটিকসের মতো খেলার মৌলিক নিয়মের পাশাপাশি আত্মরক্ষার জন্য জুডো, কারাতে ও তায়কোয়ান্দোর কৌশল শেখানো হবে।
খেলার মাঠে বা দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো আঘাত ও ইনজুরি সামলানোর বাস্তবসম্মত প্রাথমিক চিকিৎসা পদ্ধতিও চিত্রসহ বইটিতে যুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া এই বইয়ের একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্পে একজন প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষকের হাত ধরে শিক্ষার্থীদের জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সফল হওয়ার কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে, যা খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে গ্রহণের ক্ষেত্রেও উদ্বুদ্ধ করবে।
অন্যদিকে, দেশের লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে ১১টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইটি। এতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা, সামাজিক রীতিনীতি, ভাষা ও শিল্পকলার বর্ণিল চিত্রায়ণ রাখা হয়েছে। এই বইয়ের একটি বিশেষ অধ্যায়ে ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যাত্রা শুরু করা জনপ্রিয় শিশু-কিশোর প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস ও দুর্লভ বিজয়ীদের ছবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই অধ্যায়টি শিক্ষার্থীদের দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগী করে তুলবে।
এনসিটিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য প্রণীত ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ভয় দূর করতে ৬টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শিখবে যে, শেখা মানে কেবল মুখস্থ করা নয় বরং সৃজনশীলতা, পরিবেশ নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সচেতনতা ও পারস্পরিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জ্ঞানের চর্চা করা। এই নতুন শিখন পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি বাড়াতে সহায়ক হবে।
একইভাবে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে ৮টি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটি।
এর লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার অভ্যাস তৈরি করা। এনসিটিবি চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানান, বইগুলোর পাণ্ডুলিপি ও ভ্যালিডেশন কাজ শেষ হয়েছে এবং অনুমোদন সাপেক্ষে দ্রুত মুদ্রণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। এছাড়া উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানিয়েছেন, আগামীতে পর্যায়ক্রমে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিষয়ক শিক্ষা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে প্রকৃত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।