বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে ‘গুপ্ত-সুপ্ত’ রাজনীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একে অপরের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশকারী ও প্রক্সি সংগঠন ব্যবহারের অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের ঘটনায় এই ইস্যু এখন বেশ সরব। মূলত কে কোন দলের আদর্শে চলছেন, কার প্রকৃত আনুগত্য কোথায়—এমন নানা প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। এই তারা এবং ওরা, ঐযে যারা পালিয়ে গেছে, স্বৈরাচার এবং গুপ্ত -তারা আবার একসঙ্গে হয়েছে। তবে গুপ্ত রাজনীতি প্রসঙ্গ দুই দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বক্তব্যেই পরে আর সীমাবদ্ধ থাকেনি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ যে বেনামি রাজনীতি যেটাকে বলা হচ্ছে গুপ্ত, রাজনীতিতে এ শব্দটি আসল কীভাবে। আর রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ আখ্যা দেওয়ার এই প্রবণতা কি দলগুলোর মধ্যে বিভাজন আর অবিশ্বাস-সন্দেহ বাড়াচ্ছে। ঢালাও দুই/তিনশত সদস্য বা তার বেশি লোক নিয়ে তারা কমিটি করেন না।
সাম্প্রতিক সময়ে এই বিতর্ক নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে খোদ বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও দলীয় নেতাদের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে। গত ১ অক্টোবর ফেনীতে এক জনসভায় তারেক রহমান এ বিষয়ে কঠোর প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানতে চান, যারা এখন বিভিন্ন কৌশলী অবস্থান নিচ্ছেন, তারা অতীতে রাজপথে ছিলেন কি না। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ১৯৯১ ও ১৯৮৬ সালসহ বিভিন্ন সময়ে বিশেষ গোষ্ঠীগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছে। গত নির্বাচনের সময়ও এমন আঁতাতের অভিযোগ তোলেন তিনি। এসব নিয়ে পালটাপালটি অভিযোগও করছেন বিভিন্ন দলের নেতারা। কেউ যখন পরিচয় গোপন করে তার ভিন্ন আদর্শের বা ভিন্ন চিন্তার কোনো দলে অনুপ্রবেশ করে রাজনীতিতে তৎপর থাকেন, পরে নিজের সুবিধাজনক সময়ে ওই দল থেকে বেরিয়ে নিজের পছন্দের আদর্শের দলের জন্য প্রকাশ্যে আসেন-সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের কিছু উদাহরণ আলোচনায় এসেছে, বিতর্ক হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে দলীয় পদ-পদবি থাকলে নেতৃত্বে আসা যায় না। ফলে ছাত্রদলের নেতারা সেখানে যেতে না পারলেও শিবির পারে। একটা গ্রুপ তো ডাকসু নির্বাচনের আগে আমার প্রার্থীতা চ্যালেঞ্জ করে কোর্টে রিটও করেছিল।
এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ঢাকায় বাইতুল মোকাররমের সামনে এক সমাবেশে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, বিএনপির আন্দোলনের সময় তাদের অনেকের দেখা পাওয়া যায়নি, বরং জামায়াত-শিবির মাঠে লড়াই করেছে। তিনি বিএনপি নেতাকে ইঙ্গিত করে বলেন, আপনারা জামায়াতকে গুপ্ত বলছেন, অথচ অতীতে আপনাদের সাথেই তো তারা ছিল। অথচ আমরা প্রতি বছর জানুয়ারিতে আমরা আমাদের একশত বত্রিশটি শাখায় কমিটি করি। শিক্ষার্থীরা যদি প্রশাসনকে মতামত জানায় এর পক্ষে তাহলে আমরা হলগুলোতেও কমিটি দেব।
তাত্ত্বিক বা আদর্শগত বিতর্কের বাইরে গিয়ে গত ১৫ অক্টোবর সরকারের প্রতিমন্ত্রী ও গণঅধিকার পরিষদের শীর্ষ নেতা নুরুল হক নুর নতুন এক অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেন, জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন প্রক্সি সংগঠন তৈরি করে রাজনীতির মাঠে ব্যবহার করছে। তার মতে, জুলাই বিপ্লবের পর গড়ে ওঠা বিভিন্ন সাইনবোর্ড ও দোকানের আশি শতাংশই জামায়াত-শিবিরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্রকাশ্য তৎপরতা শুরু হলে ‘গুপ্ত রাজনীতির’ বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে আসে। সেই সময় অভিযোগ ওঠে, শিবিরের অনেক নেতা অতীতে গোপনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বিশেষত বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল এই অভিযোগগুলো জোরালোভাবে প্রচার করে। বাংলাদেশে গুপ্ত রাজনীতি নিয়ে প্রথম জোরালো আলোচনা শুরু হয় মূলত: ২০২৪ সালে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব দাবি করেন, শিবিরের অনেকে তাদের পরিচয় গোপন রেখে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে।
এমনকি ছাত্রলীগের বিতর্কিত অনেক নেতা এখন শিবিরের পতাকাতলে আশ্রয় নিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তবে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তার দাবি, ছাত্রলীগ নেতাদের সাথে প্রচারিত তার নিজের ছবিগুলো কোনো দলীয় প্রোগ্রামের নয়, বরং ডিবেটিং সোসাইটির আয়োজনের। তাদের কাউকে তারা ডিবেটিং সোসাইটিতে পাঠায়, কাউকে তারা সাংবাদিক সমিতিতে পাঠায়। ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, ছাত্রদল তো তিন-চার বছরে মনে হয় ত্রিশ থেকে চল্লিশটা কমিটি দিতে পেরেছে সারা দেশে। এটাকে তারা মনে করে যে বিশাল ব্যাপার। ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে আমার যে ছবি প্রচার করা হয়, সেগুলো দলীয় কোন প্রোগ্রাম নয়। আমি বহুবার বলেছি, এই ছবিগুলো ডিবেটিং ক্লাবের অনুষ্ঠানের।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিবিরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকা প্রসঙ্গে এস এম ফরহাদ জানান, তাদের সাংগঠনিক কাঠামো ভিন্ন এবং তারা ছোট আকারে কমিটি গঠন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হলভিত্তিক রাজনীতি থাকবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তাই ছাত্রশিবির পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রতিটা কমিটি আপনি শিবিরের ওয়েবসাইটে পাবেন। আর যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সমস্যা নেই, সেখানে আমরা হল পর্যায়েও কমিটি দিয়েছি।
রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরিন এই প্রবণতাকে এক ধরনের গভীর অবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, গত দুই দশকে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির ধরনে পরিবর্তন এসেছে। আগে নিষিদ্ধ দলগুলো গোপনে কার্যক্রম চালাত, কিন্তু এখন মূলধারার দলগুলোই কৌশলে বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করছে। একে অন্যের ওপর এই অবিশ্বাস এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিরপেক্ষ কোনো ব্যক্তি বা অতীতের ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কাউকে সহজে গ্রহণ করতে চায় না দলগুলো। একইসময়ে ছাত্রশিবিরও ছিল একরকম নিষিদ্ধ।
বিএনপি কেন এই ইস্যুকে এতোটা গুরুত্ব দিচ্ছে, এমন প্রশ্নে বিশ্লেষকরা বলছেন, দলটির ভেতরে এক ধরনের ষড়যন্ত্রের ভয় কাজ করছে। জামায়াতে ইসলামী সংস্কারের নামে বা জুলাই জাতীয় সনদের দোহাই দিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে কি না—এমন শঙ্কা থেকেই বিএনপি এই ‘গুপ্ত রাজনীতি’র অভিযোগ বারবার সামনে আনছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এ ধরনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, তাদের মূল লক্ষ্য হলো জনগণের জুলাই জাতীয় সনদের রায় এবং গণভোটের দাবি বাস্তবায়ন করা। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বিএনপিতে এমন অনেক নতুন মন্ত্রী বা নেতাকে দেখা যাচ্ছে, যাদের গত চল্লিশ বছরের রাজনীতিতে কখনো রাজপথে দেখা যায়নি। তিনি দাবি করেন, এসব অভিযোগ আসলে মূল ইস্যু থেকে জনগণের দৃষ্টি সরানোর একটি কৌশল মাত্র। তাদের পলিটিক্সে কারা, কী করছে সেটাও বোঝা যাচ্ছে না।