প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে চারটির বেশি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। প্রতিনিধিদল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে জাপান যাবে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর চার দিনের সরকারি সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।
এই সফরকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বে নতুন গতি সঞ্চারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই নেতা নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন।
সফরকে সামনে রেখে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ প্রায় আটটি দলিল চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
চূড়ান্ত আলোচনার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই সই হওয়া এমওইউর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারিত হবে।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম আশা প্রকাশ করেন যে, সফরকালে এসব সমঝোতা স্মারকের বেশিরভাগই স্বাক্ষরিত হবে।
প্রত্যাশিত যৌথ বিবৃতিতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফলাফল এবং বাংলাদেশ-জাপান কৌশলগত অংশীদারত্ব এগিয়ে নেওয়ার ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরা হবে।
সফরকালীন গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি
- দ্বিপক্ষীয় বৈঠক: ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও মধ্যাহ্নভোজ।
- ব্যবসায়িক ফোরাম: জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন এবং জাপানি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা।
- প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ: জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লীগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক।
- উন্নয়ন ও বাণিজ্য সংস্থাসমূহের সঙ্গে আলোচনা: জাইকা প্রেসিডেন্ট, জেবিআইসি গভর্নর এবং জেট্রোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক।
- সামাজিক ও কৌশলগত বৈঠক: সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
- প্রযুক্তিগত পরিদর্শন: সফরসূচিতে চিবা অঞ্চলের এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নাগোয়ার টয়োটা কারখানা পরিদর্শন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, প্রস্তাবিত চুক্তিগুলো বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে জাপানের শিল্প-অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার সংযোগ ঘটাতে পারে। প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকগুলো উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত খাতগুলোতে সহযোগিতার আরও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারে।’’। এ ধরনের সহযোগিতা আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদন পদ্ধতি, মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে।’’।
তিনি বলেন, কৃষি ও মৎস্য খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের পাশাপাশি ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
জাপানি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশীয় সরবরাহকারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।
অধ্যাপক চৌধুরী আরও বলেন, বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি জাপানের মাঝারি আকারের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের অংশীদারত্ব উৎসাহিত করতে হবে। সফর শেষে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, সময়সীমা এবং অগ্রগতি পর্যালোচনার সমন্বয়ে একটি কার্যকর বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রণয়নেরও পরামর্শ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারদ স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মন্ত্রী, উপদেষ্টা, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং প্রতিনিধিদলের অন্যান্য সদস্য সফর করবেন।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, আলোচনা শুধু অবকাঠামো বা মেট্রোরেল প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হিসেবে থাকবে। ২০১৪ সালে চালু হওয়া ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগের আওতায় অবকাঠামো ও শিল্প যোগাযোগব্যবস্থা জোরদার করা হবে। এছাড়া দুই দেশ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের বিষয়েও আলোচনা করবে। সামগ্রিকভাবে, নতুন সহযোগিতা কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ জোরদার করাই এ সফরের মূল লক্ষ্য। পরিশেষে, সমঝোতা স্মারক সই কেবল একটি সূচনা; এর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, কর্মীদের জন্য উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্প খাতের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা।’’। সমঝোতা স্মারক সইয়ের বাইরেও এ সফরে চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি সই হওয়া অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়ন এগিয়ে নেওয়া এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। ঢাকার এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয় ৮৩ শতাংশ এবং এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পের ব্যয় ১১৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় ও অর্থায়নের শর্তও আলোচনায় আসবে। সিয়াম বলেন, ‘‘আমরা সব দেশ থেকেই কম সুদে ঋণ পেতে চাই। তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক অর্থায়নব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দেশভিত্তিক বিভিন্ন বিষয় আলোচনার ফলাফলকে প্রভাবিত করবে। জাপান বাংলাদেশে মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী অবকাঠামো উন্নয়নসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পে সহায়তা করছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- তিনি বলেন, ‘‘প্রস্তুত জমি, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, পরিবহন যোগাযোগ এবং অনুমোদন পাওয়ার পূর্বানুমেয় প্রক্রিয়া বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে কার্যকর ব্যবসায় রূপ দিতে সহায়তা করবে।’’।
- সূত্র: বাসস।