হবিগঞ্জ শহরতলির ধুলিয়াখাল এলাকায় স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসনের লক্ষ্যে ২০১৭ সালে অনুমোদিত ‘সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প’-এর ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। ২৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে ১৩২টি আবাসিক প্লটের বিপরীতে ইতিমধ্যে ৬৯৬টি আবেদন জমা পড়েছে। কিন্তু আট মাস পেরিয়ে গেলেও লটারির মাধ্যমে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এর মধ্যেই জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ নতুন করে আবারও আবেদন নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করায় প্লটপ্রত্যাশীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, হবিগঞ্জ শহরতলির ধুলিয়াখাল এলাকায় ২০১৬ সালে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সিলেট বিভাগের অধীন স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ‘সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়। ২০১৭ সালে প্রকল্পটির ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) অনুমোদন পায়। এতে প্লট পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা মানুষের অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ করে ভূমি উন্নয়নের জন্য মাটি ভরাটের কাজও শেষ হয়েছে। ১৩২ প্লটের জন্য ৬৯৬ আবেদন গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের শুরুতে প্লট বরাদ্দের জন্য জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আবেদন আহ্বান করা হয়। বরাদ্দপত্র জারির পাঁচ বছরের মধ্যে অবশ্যই সরকার নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী বাড়ি নির্মাণ করতে হবে।

প্রকল্পটির প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, এখানে আড়াই থেকে পাঁচ কাঠা বা তার চেয়ে বড় আয়তনের মোট ১৩২টি প্লট রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে এই প্লটগুলোর জন্য আবেদন আহ্বান করা হলে প্রায় ১১০০টি আবেদনপত্র বিক্রি হয়। ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে জামানতসহ মোট ৬৯৬টি আবেদন জমা পড়ে। নিয়ম অনুযায়ী চার কাঠার নিচের প্লটের জন্য দেড় লাখ টাকা এবং চার কাঠা বা তার বেশি আয়তনের প্লটের জন্য দুই লাখ টাকা করে জামানত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, এভাবে গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা জামানত সংগ্রহ করেছে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ।

প্লটপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, প্রকল্পের লটারি হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে নতুন করে আবেদন নেওয়ার উদ্যোগটি স্বচ্ছ নয়। প্রকল্পের প্রসপেক্টাসে কাঠাপ্রতি জমির দাম ধরা হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ ১৩ হাজার টাকা। বরাদ্দ প্রাপ্তরা কিস্তিতে এই অর্থ পরিশোধের সুযোগ পাবেন। তবে এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন। স্থানীয়রা বলছেন, আট মাস পর নতুন করে আবেদন নেওয়া মানেই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের লোকদের প্লট পাইয়ে দেওয়ার একটি সুযোগ সৃষ্টি করা। তাদের মতে, সরকারি নিয়ম মেনে যারা দীর্ঘদিন ধরে জামানত দিয়ে অপেক্ষা করছেন, তাদের স্বপ্নের এই আবাসনে এখন অনিয়ম ও দুর্নীতির ছায়া পড়ছে। প্লট বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তি কিস্তিতে অথবা এককালীন এই অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের লটারি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ জি কে গউছের অনুরোধে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় লটারি কার্যক্রম স্থগিত করেছে। সংসদ সদস্য জি কে গউছ দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সাধারণ মানুষ যথাযথভাবে আবেদনের সুযোগ পায়নি। তাই নতুন করে আবেদন নিলে অংশগ্রহণ বাড়বে। তিনি বলেন, এখানে দেখার বিষয় নিরপেক্ষভাবে লটারি হচ্ছে কি না, আর সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সিলেট বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) নেজামুল হক মজুমদার জানান, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তারা নতুন করে আবেদন গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, আগের জমানো ৬৯৬টি আবেদনের সঙ্গে নতুন আবেদনগুলো যোগ করে লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হবে। হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, মন্ত্রণালয় থেকে আসা আদেশের প্রেক্ষিতেই তাদের এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হচ্ছে, যদিও তিনি চেয়েছেন সাধারণ মানুষ যেন কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

আবেদনকারী কামাল আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, এতো আবেদন জমা পড়ার পরও নতুন করে আবেদনের সুযোগ দেওয়া মানেই দলীয় কর্মীদের এ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং ভাগ-বাঁটোয়ারা করা। একই ব্যাংকিং পেশাজীবী মো. হাবিবুর রহমান বলেন, সীমিত আয়ের মানুষ হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে জামানতের টাকা আটকে থাকায় তিনি অসহায় বোধ করছেন। এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক মিছবাহুল বারী বলেন, স্বল্প আয়ের মানুষ তাদের শেষ সম্বল দিয়ে এই জামানত জমা দিয়েছেন। কর্তৃপক্ষের উচিত বিদ্যমান আবেদন থেকেই দ্রুত প্লট বরাদ্দ দেওয়া, অন্যথায় বিলম্বের কারণে মানুষ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ শেষ না হওয়া এবং নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি করায় বরাদ্দপ্রাপ্তদের মাঝে অস্বস্তি বেড়েই চলছে। হবিগঞ্জের বাসিন্দাদের মধ্যে এ রকম আবেদনকারী ৬৯৬ জন।