প্রয়াত হয়েছেন বিশিষ্ট কবি, অনুবাদক ও সাংবাদিক রথো রাফি। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার ভাই এহতেশাম। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫১ বছর। গত সোমবার ফুসফুস ও কিডনির দীর্ঘস্থায়ী জটিলতায় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করা হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫১ বছর।
১৯৭৫ সালের ৩১ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায় জন্ম নেওয়া রথো রাফি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিলেও সাহিত্যাঙ্গনে তিনি পরিচিত ছিলেন স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরের কবি হিসেবে। নব্বইয়ের দশকে সাহিত্যচর্চায় আত্মপ্রকাশের পর তিনি ছোটকাগজ আন্দোলন ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী সাহিত্যিক ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে ‘গাণ্ডীব’ নামের ছোটকাগজের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে তার সরব উপস্থিতি ছিল দীর্ঘ সময় ধরে। সাময়িকীটির ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু সময়েও এই সম্পর্ক অটুট ছিল।
দীর্ঘদিন নতুন বই প্রকাশ না করার মানসিকতা সত্ত্বেও সমকালীন কবিতার পরিমণ্ডলে তিনি নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছিলেন।
২০২০ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম ও একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘অক্ষর ও বালির পৃথিবী’। ৪৩২ পৃষ্ঠার এই সংকলনটিতে ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুই দশকের লেখা দুই শতাধিক কবিতা স্থান পেয়েছে। তার কবিতার বিষয়বস্তু ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়; জন্ম-মৃত্যুর দর্শন থেকে শুরু করে যিশুর ক্রুশযাত্রা কিংবা কৃষ্ণের বাঁশির অনুষঙ্গ—বিভিন্ন দার্শনিক ও ধর্মীয় আবহ তার লেখায় মূর্ত হয়ে উঠেছে।
রথো রাফি কেবল নিজস্ব সৃষ্টিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, অনুবাদক হিসেবেও তিনি রেখে গেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান। এরিখ ফ্রাইড, চার্লস বুকোস্কি, মুহাম্মদ আল-মাঘুত ও ইয়ারোস্লাভ সাইফার্টের মতো বিশ্বখ্যাত কবিদের কবিতা তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছেন। তার প্রতিটি অনুবাদে মূল কবিতার আবেগের পাশাপাশি দার্শনিক গভীরতা বজায় রাখার একটি সচেষ্ট প্রয়াস লক্ষ্য করা গেছে। রসায়নশাস্ত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিলেও কবিতা ও বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদ তার মনন ও সৃজনশীলতার বড় অংশজুড়ে ছিল। প্রচলিত আবেগের প্রকাশের বাইরে গিয়ে চিন্তার গভীরতা নির্মাণের চেষ্টা ছিল তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এসব কাজের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে বিশ্বকবিতার নানা ধারা ও কণ্ঠ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। তার প্রয়াণে বাংলা কবিতার এমন এক স্বর থেমে গেল, যার পরিচয় গড়ে উঠেছিল প্রচারের চেয়ে সৃষ্টির গভীরতায়।
বৌদ্ধিক অন্বেষণ ছিল তার কাব্যদর্শন ও চর্চার মূল কেন্দ্রবিন্দু। আবেগের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জনকে তিনি কবিতায় অধিক গুরুত্ব দিতেন। প্রকাশনার প্রতি অনীহা ও নিজস্ব ভাষাভঙ্গির কারণে সমকালীন কবিদের ভিড়ে তিনি ছিলেন এক স্বতন্ত্র নাম। নিরাভরণ ও মিতভাষী এই কবির প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য এক সৃজনশীল অনুবাদক ও সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বকে হারাল, যিনি প্রচারের আলোর চেয়ে কাজের গভীরতাকেই সবসময় প্রাধান্য দিতেন। তার বিশ্বাস ছিল, কবিতায় কেবল আবেগতাড়িত সাড়া নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।