দেশের সর্ববৃহৎ তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দুটি অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ‘তিতাস-৩২’ ও ‘তিতাস-৩৩’ নামের এই কূপ দুটি খনন বাস্তবায়নে মোট খরচ ধরা হয়েছে ৫৯২ কোটি টাকা। প্রকল্প থেকে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে আনুমানিক ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং ১৮ ব্যারেল কনডেনসেট যুক্ত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। কূপ দুটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে পরিচালিত ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের কথা রয়েছে। বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই সভায় সভাপতিত্ব করবেন একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আওতায় পেট্রোবাংলার অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) এটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরকারি তহবিল থেকে ৪১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং বিজিএফসিএলের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা জোগানের কথা বলা হয়েছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানান, দেশীয় গ্যাসের যোগান বাড়লে তা জাতীয় গ্রিডের চাপ কমানোর পাশাপাশি আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা হ্রাস করবে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি এবং পরবর্তী সময়ে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ার ফলে শিল্পোন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

প্রকল্পের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী ১০ বছরে নতুন এই দুটি কূপ থেকে প্রায় ১০০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং ৬০ হাজার ৪৪৪ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া সম্ভব। বর্তমান উৎপাদনমূল্যে এই সম্পদের আনুমানিক দাম ৩৩৯ কোটি ৭ লাখ টাকা, যার মধ্যে গ্যাসের মূল্য ২৮৫ কোটি ২৬ লাখ ও কনডেনসেটের মূল্য ৫৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। তবে ভোক্তা পর্যায়ে এই পরিমাণ গ্যাসের বাজারমূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৬ হাজার ৫২৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

প্রকল্পের আওতায় বিদেশী ঠিকাদারের সাহায্যে কূপ খনন, দেশি-বিদেশি পরামর্শক সেবা এবং গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন নির্মাণসহ অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন হবে। ২০১৬ সালের ভূকম্পন জরিপ তথ্যের ভিত্তিতে চাইনিজ প্রতিষ্ঠান বিজিপি ইনকরপোরেটেড ১৬টি নতুন ও ৭টি গভীর কূপ খননের যে সুপারিশ করেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় এ উদ্যোগ। পরবর্তীতে ২০২৬ সালে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করে। এসব তথ্য পর্যালোচনার জন্য বিজিএফসিএল চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (সিএনপিসি) প্রতিষ্ঠান বিজিপি ইনকরপোরেটেডকে নিয়োগ দিয়েছিল।

উল্লেখ্য, শুরুতে এই প্রকল্পের আনুমানিক বাজেট ৬৩২ কোটি টাকা রাখা হলেও ২০২৬ সালের ১৮ জুনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সুপারিশে ব্যয় ৪০ কোটি টাকা কমিয়ে ৫৯২ কোটি টাকায় পুনঃনির্ধারণ করা হয়। বিজিএফসিএল তাদের ছয়টি ক্ষেত্র থেকে বর্তমানে দৈনিক ৪৮০ থেকে ৪৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দিচ্ছে, যার মধ্যে কেবল তিতাসেরই ২৩টি সক্রিয় কূপ থেকে উৎপাদিত হচ্ছে ৩৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। পরিকল্পনা কমিশনের মতে, নিজস্ব কূপ বাড়িয়ে এলএনজি আমদানি কমাতে পারলে তা মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি শিল্পখাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।