ভারতের আসামে গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর দুই দিনে এক হাজার ১০০টিরও বেশি মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মূলত বাঙালি মুসলিম অধ্যুষিত নগাঁও, হোজাই ও গোলাঘাট জেলায় এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের প্রথম দিনেই তিনটি জেলায় ৫৪৭টি পরিবারকে বাস্তুচ্যুত করা হয়। এর মধ্যে নগাঁও জেলায় ৩৩৬টি, হোজাইয়ে ১৫২টি এবং গোলাঘাটে ৫৯টি পরিবার ছিল। পরবর্তীতে ১৮ অক্টোবর নগাঁও জেলার লুটুমারি-লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আরও ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবারের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়। গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর এসব অভিযান চালানো হয় বলে সরকারি কর্মকর্তা ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ দাবি করেছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করছেন। আব্দুল নূর নামের এক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি জানান, ১৯৭৪ সাল থেকে তার পরিবার ওই জমিতে বসবাস করছিল। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এই উচ্ছেদ অভিযানে কয়েক দশক পুরোনো ১০টিরও বেশি মসজিদও ভেঙে ফেলা হয়েছে। বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, তাদের পূর্বপুরুষেরা ব্রিটিশ আমলে প্রচলিত ‘টাউঙ্গিয়া’ ব্যবস্থার আওতায় বন বিভাগের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন এবং তখন থেকেই সরকার তাদের সেখানে বসবাসের সুযোগ দিয়েছিল। উচ্ছেদে বাড়ি হারানো আবদুল নূর জানান, ১৯৭৪ সালে তার পরিবারকে ওই জমি দেওয়া হয়েছিল। তবে, নিজেদের অবৈধ দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন লুটুমারির বাসিন্দারা।

আইনি লড়াইয়েও কোনো সুরাহা পায়নি উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো। তারা বিষয়টি নিয়ে গৌহাটি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, তবে আদালত গত জুনে তাদের ৩০ দিনের মধ্যে এলাকা খালি করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষা করা জনস্বার্থের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দাবির চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। নির্দেশ অনুযায়ী নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর ওই এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এর আগে লুটুমারি এলাকায় গত নভেম্বরেও এক দফায় অভিযান চালানো হয়, যেখানে প্রায় এক হাজার ৭০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অভিযানের সময় অনেক বাসিন্দা খননযন্ত্র পৌঁছানোর আগেই নিজেদের মালপত্র নিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন।

সরকার ও বন বিভাগের দাবি, সরকারি জমি ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল অবৈধ দখলদারমুক্ত করতেই এই ধারাবাহিক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে এবং এটি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকতে পারে। এ ছাড়া হোজাইয়ের যমুনা-মৌডাঙ্গা ও গোলাঘাটের ২ নম্বর নেঘেরিবিল এলাকাতেও একই ধরনের উচ্ছেদ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আসামে বিজেপির গত এক দশকের শাসনামলে সরকারি ভূমি থেকে প্রায় ১৯ হাজার পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, যার অধিকাংশ মুসলিম পরিবারের সদস্য। এসব অভিযানকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে ভূমির মালিকানা ও উচ্ছেদ হওয়া মানুষদের পুনর্বাসনের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।