আড়াই সপ্তাহের ব্যবধানে ফেরদৌসী আহমেদ (মিষ্টি) এবং ইশরাক হোসেনকে নিজ নিজ পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি সরকার ও দলের ভেতরে একটি স্পষ্ট ও কড়া বার্তা প্রদান করেছেন। বার্তাটি কেবল তাদের দুজনের জন্যই নয়, বরং দলের সকল মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতা-কর্মীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা সীমা অতিক্রম করে সরকার ও দলকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার বিষয়টি যে কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না, তা এই পদত্যাগের ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে। আরেকজন মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী সবকিছু নিয়মের মধ্যে রাখতে চান।
মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ভাঙচুর ও হামলার ঘটনার পর সংসদ সদস্য পদ ছাড়তে হয়েছিল ফেরদৌসী আহমেদকে।
এর আগে গত ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পেয়ে তিনি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন।
এরপর তাঁর আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে, অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়া প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে গত রোববার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে পদত্যাগের নির্দেশ দেন সরকারপ্রধান। এরপর সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দেন। রাড্ডার ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ নিজের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন, তেমনি ইশরাকও তাঁর অস্ত্র হাতে অভিযানের পক্ষে আত্মরক্ষার যুক্তি তুলে ধরেছেন। তবে উভয় ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান অপরিবর্তিত ছিল। ‘নাই’ শব্দের মানে খুঁজতে গিয়ে জানলাম প্রতিমন্ত্রী ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশের কথা।
ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের পর সরকার ও বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দলের ভাবমূর্তি বজায় রাখা এবং ক্ষমতার দাপট কমিয়ে দায়িত্বের সীমা কঠোরভাবে মেনে চলাই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। ব্যক্তির বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায় যাতে সরকার বা দলকে বহন করতে না হয়, সে বিষয়টিই এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। নিজেকে জাহির করতে গিয়ে মন্ত্রিত্ব হারালেন ইশরাক। তবে তাঁরা কেউ নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ ছাড়া ব্যক্তিকে রক্ষা করতে গিয়ে দলের বৃহত্তর স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া হবে না—এমন বার্তাও রয়েছে এসব সিদ্ধান্তে। ইশরাকের ঘটনায় দায়িত্বের সীমার প্রশ্নটি বিশেষভাবে সামনে এসেছে। অর্থাৎ ইশরাক নিজের কর্মকাণ্ডের পক্ষে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, এর বাইরে তাঁর পদ ও দায়িত্বের সঙ্গে ওই কর্মকাণ্ড কতটা সংগতিপূর্ণ, সেই প্রশ্নও গুরুত্ব পেয়েছে। ইশরাকের অস্ত্রকাণ্ডে বিএনপি ও সরকারে অস্বস্তি-অসন্তোষ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো উদ্যোগের উদ্দেশ্য ভালো হলেই দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করার সুযোগ তৈরি হয় না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা সবার দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী বরাবরই এটি মনে করিয়ে দিচ্ছেন এবং তিনি নিজে অত্যন্ত সাদামাটা ও বিনয়ী জীবনযাপনের মাধ্যমে সবার সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। দলের প্রত্যেকেরই প্রধানমন্ত্রীর এই জীবনধারা অনুসরণ করা উচিত।
সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মতে, রাজনৈতিক পদমর্যাদার আড়ালে কাউকে সুরক্ষা দিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ন করা হবে না। মন্ত্রিসভার এক সদস্য জানিয়েছেন, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে দাম্ভিকতা প্রকাশের সুযোগ নেই। সরকার পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজের আচরণের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং দায়িত্বের অতিরিক্ত কোনো কর্মকাণ্ডে জড়ানো যাবে না, যা সরকারের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, সবাইকে ‘সিরাতুল মোস্তাকিমের পথে’ চলার আহ্বান জানানো হয়েছে, আর যিনি এটি বুঝতে ব্যর্থ হবেন, তাঁকে বিপদে পড়তে হবে। একজনের ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যজন নিজেই বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছেন।
অস্ত্র হাতে অভিযানে নামার বিষয়ে ইশরাক হোসেন দাবি করেছিলেন, আত্মরক্ষার জন্য তিনি অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন এবং কোনো আইন ভঙ্গ করেননি। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংস্থা রয়েছে। তাদের কাজ একজন প্রতিমন্ত্রী নিজের হাতে তুলে নিয়ে যেভাবে মাঠে নেমেছেন, তা সামগ্রিকভাবে সরকারকে বিব্রত করেছে। সব মিলিয়ে সরকারপ্রধানের এই কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করছে যে, দায়িত্ব পালনের নামে বাড়াবাড়ি বা সীমা অতিক্রম করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। গত শনিবার গেন্ডারিয়ায় তাঁর অস্ত্র হাতে অভিযানে নামার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনা শুরু হয়।