ম্যানচেস্টার সিটির আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে মন্তব্যের জেরে ব্রিটিশ রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের দায়ে ক্লাবটি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম তাদের মালিকপক্ষের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন। এই মন্তব্যের পর বিরোধী দল প্রশ্ন তুলেছে, আবুধাবিভিত্তিক মালিকপক্ষের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ। সমালোচনার মুখে বার্নহ্যাম এখন ম্যান সিটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিজের অতীতের সব বৈঠকের বিবরণ জনসমক্ষে প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই রায় ঘোষণার পরই বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসেন বার্নহ্যাম।

প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সাম্প্রতিক কোনো বৈঠক হয়নি। বরং উল্লেখযোগ্য একটি বৈঠক হয়েছিল ২০২১ সালে। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র থাকাকালে শহরটির অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে তিনি বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত মেয়র থাকাকালীন সময়ের সব কর্মকাণ্ড তিনি স্বচ্ছভাবে তুলে ধরবেন। আমি আনন্দের সঙ্গেই তা করতে রাজি এবং সেটাই করব।’। বার্নহ্যাম আরও বলেন, ‘গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে আগের দায়িত্ব পালনের সময় তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে যা কিছু করেছি, সবই পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করব। আসলে আমার বৈঠকগুলোর কোনোটিই সাম্প্রতিক সময়ের নয়।

আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের বিষয়টি বিশদভাবে পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নয় বছরে ম্যানচেস্টার সিটি বড় ধরনের অনিয়ম করেছে। প্রিমিয়ার লিগের স্বাধীন কমিশনের অনুসন্ধানে জানা যায়, বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে ভুয়া চুক্তি করে গোপন উপায়ে ৮৩ কোটি পাউন্ডের বেশি অর্থ ক্লাবের ফুটবল কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। গত মাসে প্রকাশিত রায়ে একটি অভিযোগ ছাড়া বাকি সব কটিতেই ক্লাবটি দোষী প্রমাণিত হয়েছে। যদিও সিটি কর্তৃপক্ষ সব অভিযোগ অস্বীকার করে আপিল করেছে, তবুও স্বাধীন কমিশনের প্রতিবেদনের গাম্ভীর্য এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে আর্থিক নিয়ম ভেঙেছে ম্যানচেস্টার সিটি। তবু দুর্দান্ত সিটি, লিভারপুলকে উড়িয়ে ছয়ে ছয়।

এর আগে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বার্নহ্যাম বলেছিলেন, দোষী হওয়ার পর মালিকেরা ক্লাব বিক্রি করে দিলে তিনি উদ্বিগ্ন হবেন। তার এমন অবস্থান দেখে প্রিমিয়ার লিগের অন্য ক্লাবগুলো বিস্মিত হয়েছিল। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি বাডেনক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সিটির কর্মকর্তাদের বৈঠকের নথি প্রকাশের দাবি জানান। বিবিসি স্পোর্টকে সূত্রগুলো জানিয়েছে, বার্নহামের অবস্থান দেখে ক্লাবগুলো এতটাই ‘হতবাক’ হয়েছিল যে আপিলের প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও তৈরি হয়।

‘দ্য রেস্ট ইজ পলিটিকস’ পডকাস্টে বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, তিনি বাডেনকের দাবি মেনে নিতে প্রস্তুত। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ফুটবলের আর্থিক অনিয়ম এবং বিনিয়োগের বিষয়কে এক করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তার ভাষ্যমতে, সাক্ষাৎকারে তিনি যে মন্তব্য করেছিলেন, তা ছিল পরিস্থিতির চাপের মুখে এবং তখন লেবার পার্টির সম্মেলন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তিনি পুরো বিষয়টি হয়তো গুছিয়ে বলতে পারেননি।

স্বাধীন কমিশন ২০২৪ সালে টানা ৪২ দিন শুনানি পরিচালনার পর এই রায় দেয়। কমিশনের পর্যবেক্ষণে সিটির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর বিষয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে, যারা জেনেশুনে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর সাক্ষ্য দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন বিষয়টি একটি স্বাধীন আপিল বোর্ডের নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

রাজনৈতিক এই ডামাডোলের মধ্যেই রোববার অ্যানফিল্ডে লিভারপুলের বিপক্ষে প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে মাঠে নেমেছিল ম্যানচেস্টার সিটি। মাঠের লড়াইয়ে ৩-০ ব্যবধানের জয় তুলে নিয়ে তারা নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে। এদিকে, পুরো ঘটনার সূত্রপাত হওয়া সেই আর্থিক মামলার পরবর্তী শুনানি ও আইনি প্রক্রিয়া প্রিমিয়ার লিগের প্রভাবমুক্ত স্বাধীন ব্যবস্থার অধীনেই পরিচালিত হচ্ছে। সিটি সমর্থকেরা অ্যানফিল্ডে কলা দেখালেন কেন।

সার্বিকভাবে, বার্নহ্যাম মনে করেন যে ফুটবল সংশ্লিষ্ট স্বাধীন অনুসন্ধানে যে তথ্য উঠে এসেছে তা অত্যন্ত গুরুতর এবং তিনি কোনোভাবেই এই অভিযোগের গুরুত্ব লঘু করে দেখছেন না। তবুও বিনিয়োগ ও ফুটবলের বিষয়কে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার ওপরই তিনি জোর দিচ্ছেন।