রাজধানীর উত্তরায় গত ২০ ডিসেম্বর সকালে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় দুই সহোদর কিশোরের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ঘটনার স্পষ্ট ভিডিও প্রমাণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও উত্তরা পূর্ব থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) কালাম ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোনো তদন্ত ছাড়াই একটি ‘মনগড়া’ মামলার মাধ্যমে নিরপরাধ বাস চালক ও হেলপারকে জেল হাজতে পাঠিয়েছেন। ঘাতক ট্রাক চালককে হাতেনাতে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েও সাহসিকতার বিনিময়ে তাদের এখন কারাবরণ করতে হচ্ছে।

ভয়াবহ সেই সকালের বর্ণনা:
গত ২০ ডিসেম্বর শনিবার, সময় তখন ভোর ০৬.৩০ ঘটিকা। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে উত্তরা পূর্ব থানাধীন বিএনএস সেন্টারের পূর্ব পাশে ময়মনসিংহ-ঢাকা মুখী ফ্লাইওভারের শেষ মাথায় দুই সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন তহুরা নেসা (৪০)। তাদের গন্তব্য ছিল বাগেরহাট। ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছিল ‘বসুমতি’ পরিবহনের একটি বাস (ঢাকা মেট্রো ব-১১-৬৯৮৪)।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ ময়মনসিংহ-ঢাকা মুখী ফ্লাইওভার থেকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে একটি ট্রাক (ঢাকা মেট্রো ট-১২-৬৬৬৭) নেমে আসে। ট্রাকটি তার নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি মালামাল (ওভারলোডিং) নিয়ে আসছিল। ফ্লাইওভার থেকে নামার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাকটি সরাসরি দাঁড়িয়ে থাকা বসুমতি বাসের পেছনে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা দেয়। এতে বাসের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা তহুরা নেসার দুই শিশু সন্তান ট্রাক ও বাসের মাঝে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়।
সাহসিকতার চরম মূল্য:
দুর্ঘটনার পর ট্রাকের হেলপার পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও বাসের চালক ও হেলপার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘাতক ট্রাক চালককে জাপটে ধরেন। এরপর উপস্থিত পথচারীরা ট্রাক চালককে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, পুলিশ ঘাতক ট্রাক চালকের সাথে সাথে বসুমতি বাসের চালক ও হেলপারকেও থানায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে জানা যায়, পুলিশ তাদের বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করে জেল হাজতে পাঠিয়ে দিয়েছে।

এসআই কালামের ‘মনগড়া’ মামলার নেপথ্যে:
এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান উত্তরা পূর্ব থানার এসআই কালাম। অভিযোগ উঠেছে, তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা শত শত মানুষের সাক্ষ্য এবং ভিডিও প্রমাণ উপেক্ষা করেছেন। ঘটনার সময় উপস্থিত অনেক পথচারী তাদের মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করেছিলেন, যেখানে স্পষ্ট দেখা যায় যে বসুমতি বাসটি স্থির অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল এবং ট্রাকটি পেছন থেকে এসে সেটিকে আঘাত করে।
কিন্তু এসআই কালাম এসব ডিজিটাল প্রমাণ যাচাই-বাছাই না করে নিজের মতো করে একটি সাজানো ঘটনা তৈরি করেন। মামলায় তিনি দাবি করেন, ট্রাক ও বাস উভয়ই বেপরোয়া গতিতে ছিল। প্রশ্ন উঠেছে, একটি দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি কীভাবে বেপরোয়া গতিতে ধাক্কা মারতে পারে যেখানে সেটি নিজেই পেছন থেকে আক্রান্ত হয়েছে?
প্রভাবশালীদের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ:
ভুক্তভোগী পরিবার ও বাস মালিক পক্ষের দাবি, ঘাতক ট্রাকের মালিক প্রভাবশালী হওয়ায় তাকে রক্ষা করতে এবং মামলাটিকে হালকা করতে এসআই কালাম এই ‘নাটক’ সাজিয়েছেন। প্রভাবশালী মহলের চাপে বাদীকে বাধ্য করা হয়েছে নিরপরাধ বাস চালক ও হেলপারকে আসামী করতে।
বাস মালিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার বাসটি দাঁড়িয়ে ছিল, আমার গাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হলো, আমার চালক-হেলপার আসামীকে ধরলো অথচ পুলিশ কোনো তদন্ত ছাড়াই তাদের আসামী বানিয়ে দিল। এটি কি দেশের আইন? এসআই কালাম সত্য গোপন করে মনগড়া কাহিনী সাজিয়ে আমাদের জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছেন।”
ওভারলোডিং ও গাফিলতি:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘাতক ট্রাকটিতে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ মালামাল বোঝাই ছিল। ওভারলোডিংয়ের কারণে ব্রেক ফেল করে বা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাক চালকের এই চরম গাফিলতির বলি হলো দুটি নিষ্পাপ প্রাণ। অথচ পুলিশ মূল অপরাধীকে আড়াল করতে নিরপরাধ ব্যক্তিদের ওপর দায় চাপাচ্ছে।
পুলিশের এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা ও জনরোষ:
এই চাঞ্চল্যকর বিষয়ে উত্তরা পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। অন্যদিকে, তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কালামের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনিও কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এবং বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন।
এদিকে, পুলিশের এমন আচরণে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনেকে বলছেন, যারা অপরাধীকে ধরিয়ে দিল, তাদেরই যদি জেল খাটতে হয়, তবে ভবিষ্যতে কেউ বিপদে এগিয়ে আসবে না। পুলিশের এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে দেশের আইন-শৃঙ্খলার প্রতি মানুষের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
একদিকে মা হারিয়েছেন তার দুই নয়নের মণি সন্তানকে, অন্যদিকে নিরপরাধ পরিবহন শ্রমিকরা কারাবন্দী। এই দ্বিমুখী অন্যায়ের বিচার চেয়ে এবং এসআই কালামের পক্ষপাতমূলক তদন্তের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছে ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী।
স্টাফ রিপোর্টার 
























